তিনি দর্শনের শিক্ষক
আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল লেখাটা সেয়ার করার। যিনি লিখেছেন তিনি দর্শনের শিক্ষক। তার ফেসবুকে সেয়ার দেয়ার কোন অপশন নেই। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করছে যারা আমার লেখা পড়েন, তাদের সাথে ভাগাভাগি করতে। তাই বাধ্য হয়েই কপি-পেস্ট করে তুলে দিলাম। সেই সঙ্গে উনাকে ট্যাগও করলাম।
এই লেখাও আমি মুছে দেব একটা সময় পর। তবে দর্শনের এই শিক্ষকের লেখা পড়ে আমার নিজেকে অতি ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। আহা, যদি এমন লিখতে পারতাম-
"বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় প্রিয় অধ্যাপকদের থেকে জেনেছিলাম, সক্রেটিস আলোচনার মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে, মন্তব্য করে, আলোচনাকে একটা বিশেষ পথে চালিত করতেন। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেই কথোপকথন এগিয়ে চলত। আলোচনার মাঝে সক্রেটিস গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে প্রতিপক্ষের বক্তব্য তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নিতেন। দর্শনের ছাত্র হিসেবে তাই প্রশ্ন উত্থাপনটা খুবই যৌক্তিক মনে হত দীর্ঘ দুই দশক যাবত। অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম তাঁর "লাইফ অ্যাজ ইট ইজ" বইটি শুরু করেছেন এই "প্রশ্ন" নামক শিরোনাম এর অধ্যায় দিয়ে! যার বিষয়বস্তুর সাথে আমার কেবলমাত্র দার্শনিক সক্রেটিস নয় এমনকি সারা বিশ্বের বহু হিন্দুধর্মানুসারীরা যাকে full filler the best মনে করেন সেই মহামানব ঠাকুর শ্রীশ্রীঅনুকূলচন্দ্রের কিছু ভাবধারার গভীর সামঞ্জস্য লক্ষ্য করলাম। শ্রীশ্রীঅনুকূলচন্দ্র মনে করতেন বিভিন্ন গ্রহে সেখানকার উপযোগী প্রাণী আছে। যে ইঙ্গিত লেখক স্পষ্টভাবেই দিয়েছেন।
এরপরের অধ্যায় "সস্তা" পড়ার পর আমি বাজারে গিয়ে বিশেষ করে কাঁচা বাজারে গিয়ে দামাদামি করা ছেড়ে দিয়েছি বলা যায়। "সস্তা" পড়ার সময় নিজেকে লেখকের মামা মনে হতে লাগল। কিন্তু আমি তো লেখকের মামাকে নয় ইতিমধ্যেই লেখককে ভালবেসে তাঁর জীবনবোধ আয়ত্ত্ব করার প্রচেষ্টা পরায়ণ। আমার ভালবাসতে ইচ্ছে করছে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে। তাদেরকে খুব ভালো বাসতে ইচ্ছে করছে যাদের সাথে একটু হাসিমুখে কথা বললে, একটু সম্মান করলে খুশিতে আটখানা হয়ে পড়ে। "স্বাভাবিক" শিরোনামের অধ্যায়কে বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছি। একই ঘটনা ঢাকা থেকে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বা অন্য কোথাও যাওয়ার সময় আমাদের সবার জীবনেই মোটামুটিভাবে ঘটে চলেছে।
থার্টি ফার্স্ট নাইটে লেখকের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা ঢাকা শহরের অধিকাংশ লোকের সাথেই ঘটছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম লেখক প্রত্যেকের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাই যেন তাঁর কি-বোর্ড চেপে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সাজেকে গিয়ে লেখকের সেজ বোনের সাথে যে ঝগড়া সেটা যেন আমাদের অনেকের ঘরে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা। আর যিনি সমালোচনা করবেন তিনি দেশদ্রোহী অথবা দেশপ্রেমিক মানেই অন্ধভাবে নীতিনির্ধারকবৃন্দদের সমস্ত কিছু সমর্থন করতে হবে কিনা বলে লেখক যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন সেটা অতীত, বর্তমান এমনকি ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটেও হয়তো সকল সচেতন মানুষের মনে ভাবনার উদ্রেক ঘটাবে বলেই আমার বিশ্বাস। ভালবাসার জন্য ব্যক্তি মানুষের আচার আচরণ কথা বলা, চিন্তা-ভাবনার যে উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা যে মোটেই ভালবাসার নিয়ামক হতে পারে না এটা চিরন্তন সত্য!
বকশিশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের শহরের রেস্টুরেন্ট আর গ্রাম বাংলার চিরচেনা রুপ। গবেষণা, আবিষ্কার ওসবে কী দরকার? পাশের জনের থেকে ভালো থাকতে হবে! ভালো দেখাতে হবে! এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গল্পটা ছেপে প্রতিবেশিদের মাঝে, কলিগদের মাঝে, ইয়ার বন্ধুদের মাঝে বিলি করব কিনা মনে মনে ভাবছি? আর "শেষের কবিতা" যেন আমাদের বর্তমান সময়ের তরুণ, যুবকদের কথাই কষে আমাদের সামনে ঘোষণা করছে। অবাক হয়ে যাই মানুষ পড়াশুনা না করে কেন পরনিন্দা, পরচর্চা, গীবত নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবে? এই ছোট্ট জীবনে কেন আমরা প্রচুর পড়াশোনা করবো না? আহ্ বোকা মানুষ! আমরা না পড়েই নাট্যকার, গবেষক, শিক্ষক হতে চাচ্ছি, হয়ে যাচ্ছি।
ওমরের "পুলিশ" হতে চাওয়া বা "একজন চা বিক্রেতা"-র চাওয়া ছেলে সেভেনের বেশি না পড়ুক এর পেছনের কারণ আমাদের সমাজের দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ। অনার্স মাস্টার্স পাশ করেও যদি নিজের খাবার নিজে জোটাতে না পারে এর চেয়ে হতাশার আর কী থাকতে পারে? তবে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ এক্ষেত্রে একটু সাধুবাদ পেতেই পারে। ব্যাঙের ছাতার মতো প্রত্যেক কলেজের অনার্স মাস্টার্স তথা তথাকথিত উচ্চ শিক্ষার স্থলে কারিগরী শিক্ষার প্রসারে যে তৎপরতা তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আদিবাসীদের মন থেকে "তোমরা" আমরা দূর করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সংখ্যা লঘু বা আদিবাসী যেন নিজেদের আলাদা না ভাবতে পারে তাহলে মানুষ হিসেবে আমরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেব। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর সত্যানুসরণ নামক গ্রন্থে বলেছেন, "যে আগে ঝাঁপ দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে সেই নেতা। নতুবা শুধু কথায় কী নেতা হওয়া যায়"?
আমি ড. আমিনুল ইসলামের :নেতৃত্ব" অধ্যায়ের "যে মানুষটা নিজ থেকে যেকোনো বিষয়ে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারবে সেই-তো নেতা। যে মানুষটা আশেপাশের সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে পারবে; অন্যরা তার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে সেই না নেতা"! কথাগুলো পড়ে অবাক হয়ে যাই। ভাবছিলাম শ্রীশ্রীঅনুকূলচন্দ্রের আদর্শকে এত দিন চর্চা করেও এমন করে ভাবতে পারলাম না।
ভালবাসার টান কর্মে আনে সফলতা জীবনের উত্থান। বুয়ার প্রতি একটু ভালবাসা কীভাবে তাকেও প্রতিদান শেখাতে পারে এভাবে আমরা ভাবিই না। লেখক যে প্রশ্ন তুলেছেন পাড়ার গলিতে মুদি দোকানের চেয়ে ফার্মেসি বেশি কেন? এ নিয়ে এখনই সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে অনুশ্রুতি গ্রুন্থের একটা ছড়া বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য "মনটা দুষ্টু হলেই জানিস/ রোগের আথাল হয়/ ঐটাকে তুই এড়িয়ে চলিস/ করবি ব্যাধি জয়"। গ্রামের মানুষের সম্পর্কে মেয়েটির ধারণা পাল্টানোর জন্য লেখকের ব্যাখ্যা চমৎকার। বয়স নিয়ে লেখকের মতো আমাকেও অপ্রস্তুত হতে হয়েছে। শুধুমাত্র বিমানবন্দরেই নয় "দায়িত্ব" ঠিকঠাক পালন মনে হয় আমাদের খুব কম সেক্টরেই খুব কম মানুষই করেন।
খুব ছোট্ট কিন্তু চমৎকার দেশ "এস্তনিয়া" সম্পর্কে পাঠক একটা ভালো ধারণা পাবেন লেখকের মাধ্যমে। আর তথাকথিত "মেধাবী"দের নিয়ে আমাদের গর্ব কেবলমাত্র মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকে নয় প্রাথমিকেও শুরু করে দিয়েছে। যার পরিবর্তন জরুরী। অন্যান্য অধ্যায়ের ন্যায় ছোট্ট "মানুষ" অধ্যায়টিও মানুষের চিন্তার জগতকে কিছুটা নাড়া দেবে।
আমি একটা অধ্যায় সচেতনভাবে এড়িয়ে এসেছি। সবার শেষে আলোচনা করবো বলে। যেই লেখা আমার ভাবনার জগতকে চরম ভাবে নাড়া দিয়েছে। আমার আচরণের পরিবর্তন করেছে। মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার লেখা এ পর্যন্ত আমার পড়া কোনো লেখকের সেরা লেখা, যা আমার আমূল পরিবর্তন করেছে ইতিমধ্যেই। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি-কলেজে পড়াই, আমার ছোট ভাই বিসিএস ক্যাডার, মাসতুতো ভাই পুলিশের কর্মকর্তা, দূর সম্পর্কের কাকা যুগ্ম সচিব, মামা উপ সচিব এই "পরিচয়" দিতে খুব গর্ববোধ করতাম। কিন্তু এ পরিচয় একেবারেই তুচ্ছ লাগছে "পরিচয়" পড়ার পরে। আমাদের দেশের একজন পুলিশ সেলুনে গিয়েও পরিচয় দেয় চুল আগে কাটাতে অথচ এস্তেনিয়ার একজন মেয়র সাধারণ যাত্রীর ন্যায় ট্রেণে চেপে বাড়ি ফেরে। তাঁর আচার আচরণে বোঝাই যায় না তিনি মেয়র, তিনি কোনো বাড়তি সুবিধা নেন না নগরপিতা হয়েও। অথচ আমাদের আমাদের নগরশালা সুমুন্ধিরাও তাদের জাহির করতে ছাড়েন না।
আমার ছাত্র ছাত্রী, বন্ধু, কলিগদের অনেককেই আমি ড. আমিনুল ইসলাম এর "লাইফ অ্যাজ ইট ইজ" পড়ার কথা বলেছি। আজকে ফেসবুক বন্ধু সবাইকেই আহবান করছি জীবন দর্শনকে সহজে বুঝতে চাইলে "লাইফ অ্যাজ ইট ইজ" একটি কপি সংগ্রহ করতে পারেন। পড়ার পর যদি মনে হয় আপনার একটুও লাভ হয় নি আমি কথা দিচ্ছি ঐ বইটা আমি নিয়ে আপনাকে সমপরিমাণ টাকা ফেরত দেব। বইটি রকমারি ডট কমে এভেইলেবেল। শুভ কামনা ড. আমিনুল ইসলাম। আপনি এমন আরো অনেক বই আমাদের উপহার দেন। আমি সমৃদ্ধ হই-আমরা সমৃদ্ধ হ
No comments