Header Ads

Header ADS

রবিশস্যের মৌসুম আসতেছে, রংপুরের কৃষক চুষে ঢাকার ফড়িয়াদের বড়লোক হবার প্রক্রিয়ার নতুন মঞ্চায়ন আসতেছে সামনে।

 রবিশস্যের মৌসুম আসতেছে, রংপুরের কৃষক চুষে ঢাকার ফড়িয়াদের বড়লোক হবার প্রক্রিয়ার নতুন মঞ্চায়ন আসতেছে সামনে।

আমি বুঝতে চেষ্টা করতেছিলাম এই বেঙ্গল ডেল্টায় এই ফড়িয়া শ্রেনিটির জন্ম কি করে হইলো? এরা কি স্বাধীন বাংলাদেশের অনন্য সৃষ্টি, নাকি এই অঞ্চলের আদিমতম শুয়াড়ের জাত?
এদের ইতিহাস এই অঞ্চলের প্রথম অর্থকরী ফসলের সাথে জড়িত। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৩) ফলে কপাল খোলে বাংলার, পাটজাত মোড়কের বিশ্বব্যাপী ডিমান্ড তৈরি হইতে থাকে সেইকালে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম তখন রোলাউট করতেছে সারা দুনিয়ায়, পণ্যের সার্কুলেশনের জন্যে পাটের বস্তার মত ডিউরেবল, সস্তা ম্যাটেরিয়াল পৃথিবীতে তখনও আসেনাই, প্লাস্টিকের আবিষ্কার ঘটবে ১৮৯৮ সালে, সেইটাও গ্লোবাল কমোডিটি মার্কেটে প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল হয়া উঠতে আরও বহু বছর সময় লাগবে। ফলে, দুনিয়ার তখন পাট এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী পণ্য।
এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাটপণ্যের বিপুল চাহিদার কারণে এই অঞ্চলে কৃষির, মানে পাটচাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটে এই সময়ে। এবং অবস্থাটা এখনকার গার্মেন্টসের মতই অনেকটা- পরিবেশের এত ক্ষতি করে পাটের চাষ পৃথিবীর আর কেউ করতে চায়নাই, অস্ট্রেলিয়ায় আর আমেরিকায় চেষ্টা করা হইছিলো-তাদের কৃষকরা বিশেষ করে পাটের আঁশ ছড়ানো আর শুকানোর মত হেভি লেবারের কাজ করবেনা বইলা দিছিলো। পাটচাষ বাংলার ইকোসিস্টেমেরও বারোটা বাজাইছিলো। তো এইযে সারা দুনিয়ার কেউ করবেনা কেবল বাংলার কৃষকই করবে- এই কৃষকের দলের রক্ত চুষে খাইতেই জন্ম নিসিলো বাংলার ফড়িয়া সমাজ, যারা আধুনিক যূগে সিন্ডিকেট নামে পরিচিত।
এই শুওরের বাচ্চারা সমস্ত দুনিয়ার সবচাইতে এনিগ্মাটিক বাটপার- সেই শুরু থেকেই। স্কটল্যান্ডের, ইংল্যান্ডের কারখানামালিকরা নিজেরা এই মার্কেটে ঢুকতেও পারতোনা, পাগল হয়া যাইতো এরা। এবং এই ফড়িয়ারা ছিলো মুলত শিক্ষিত "বাঙালি বাবু", এবং প্রথম দিকে এই বাটপারের দল মুলত হিন্দুপ্রধান ছিলো, পরে একটু অবস্থাপন্ন পাটচাষি মুসলমান কৃষকের দলও যোগ দিছে এই বাটপারিতে।
তো এদের বাটপারি বড় ক্রিয়েটিভ, এরা জামার হাতার নিচে আঙ্গুল দিয়া কাল্পনিক সংখ্যা লিখে মহাজনদের সাথে দামাদামি করতো, সে দামাদামি মুখের ভাষায় হইতোনা, হইতো সাংকেতিক ভাষায়, কারও বাপের সাধ্য নাই বুঝে। এই বাটপারির দামাদামিতে কত দাম হইলো, পাটচাষী কৃষকের বাপের পক্ষেও সেইটা জানা সম্ভব হইতোনা। ফলে আড়দ্দারের কাছে ফড়িয়া যত দামই নিক, পাটচাষিরে দিতো তার সামান্য অংশই। এরপরের বাটপারিটা করতো ওজন মাপার সময়। এই দফায় একদিক দিয়া মহাজনের ওজনদার(কয়াল) বাটপারি করে ওজন কমাইতো, আরেকদিকে ফড়িয়া তারও কম ওজনের পয়সা কৃষকেরে দিতো। এই সমস্ত বাটপারির ভেতর বৃটিশ বা ইওরোপিয়ান কেউ ঢুকতেই পারতোনা, কারণ তারা প্রাইস বার্গেইনিং করতেই পারতোনা এই কোডেড লেঙ্গুয়েজে, দ্বিতীয়ত একেকজনের মেজারমেন্ট ইউনিট একেক রকম,পাটের ভেতর ঝুট মিশানোর খেলা তো ছিলোই। এই সমস্ত বাটপারির ওপর বড় বাটপারিটা এরা যেটা করতো- ভরা মৌসুমে পাট কিনতোনা। ফলে পাটের টাকার ওপর নির্ভরশীল কৃষক একেবারে পানির দামে ফড়িয়ার কাছে, গ্রাম্য মহাজনের কাছে পাটের টাকা নিতো, পরে আড়তে পাট কেনা শুরু হইলে কৃষকের গোলা থেকে পানির দামে কেনা পাট সোনার দামে গুদামে ভরতো।
এদের সাথে কৃষকরা তো পারেনাই কুলাইতে, বৃটিশ, ইওরোপিয়ান মালিকরাও কুলাইতে পারেনাই। এরা এত শুওরের বাচ্চা, বৃটিশেরে বুঝ দিত পাটের দাম বেশি, কম দাম কইলে মুসলমান কৃষক ধরে ধরে পিটায়, ওদের সাথে গায়ের জোরে নিরীহ বাঙালি বাবু কুলাইতেই পারেনাই তাই পাটের দাম বেশি হইসে, এবং কোয়ালিটি যা দিসে তাইই নেওয়া লাগসে! অথচ এরা কৃষকেরে ঠকায়া লাল বানাইতো, এরপরে পাটের ভেতর মিশাইতো ভেজাল।
এই সিন্ডিকেটবাজি নিয়া অতিষ্ঠ হয়া ইওরোপিয়ান মালিকরা বৃটিশ সরকাররে কইলো, তোমরা পাটের প্রত্যেক বছরের ফলনের হিসাব দেও, তাইলে আমাদের দাম বুঝতে সুবিধা হবে এবং আমরাও দাম ঠিকঠাক করে দেব যেন মার্কেটে ফড়িয়ারা মাঝখানে খাইতে না পারে!
বৃটিশ সরকারের কেরানি কারা? এই ফড়িয়া বাটপারদেরই বশংবদ বাঙালি বাবু, শুওরের বাচ্চারা এক্সাক্ট ফিগার বাইর করার জন্য যেই খাটুনি খাটা লাগতো সেই খাটুনি না খেটে লামছাম একটা আন্দাইজ্জা সংখ্যা দিয়া রাখতো। ফলে দেখা যাইতো এই করেও কোনও লাভ হইলোনা, পাট আসলে কত ফলসে, আসলে কত দাম হইসে, সেইটা কোথাও কোনওভাবেই ঠিক করা গেলোনা।
এইযে একটা গ্লোবাল কমোডিটি তাদের মাটিতে ফলে, এই বাঙালি শিক্ষিত শুওরের বাচ্চারা সেই কমোডিটির গ্লোবাল মার্কেট আর টেকনোলজি তৈরি নিয়া কোনোওদিন মাথা ঘামাইলোনা। মাথা ঘামাইলো খালি এই মার্কেটের ভেতর পরজীবি হিসাবে নিজেদের অকল্পনীয় রক্তচোষা বাটপারি করার ব্যাপারে, এবং সফলভাবে পুরা পাটচাষি কৃষকের রক্ত চুষে খাইলো পরের প্রায় দেড়শো বছর, সেই সাথে পাটের ইন্ডাস্ট্রির যারা পুজিপতি, তাদের জীবনও একদম নরক বানায়ে দিলো নিজেদের বাটপারি দিয়া।
এই শুওরের বাচ্চাদের লিগেসিই এখনও চলতেসে। এখনও কৃষিপণ্যের ক্রেতারাও এই সিন্ডিকেটওয়ালাদের কাছে অসহায়, এখনোও আমলারা এই সিন্ডিকেটের পক্ষের লোক, এখনও কৃষক এই সিন্ডিকেটের হাতে মাইর খায় প্রতি বছর।
বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেনি হিসাবে জন্মই নিছে একটা বাটপারের জাত হয়া। এদের বিরুদ্ধে কৃষক এবং প্রকৃত পুজিপতিদের সুস্পষ্ট বিজয় ছাড়া, এদের কবর খুড়ে পুতে ফেলা ছাড়া এই অঞ্চলের কৃষকও কোনোওদিন ন্যায্যমুল্য পাবেনা, এই অঞ্চলের কৃষিপণ্যের ক্রেতারাও ন্যায্য মুল্যে খাইতে পারবেনা।

No comments

Powered by Blogger.