Header Ads

Header ADS

122

 'বড়দের ছোটগল্প' বইয়ের 'ক্যালেন্ডার' গল্পে বিকৃতরুচিসম্পন্ন এক ব্যক্তির বর্ণনা দিয়েছিলাম। বাস্তবেও ঐ চরিত্রের অস্তিত্ব আছে। গল্পের প্রায় পুরোটাই বাস্তব থেকেই নেওয়া, ওতপ্রোতভাবে চিনি তাকে। মেয়েদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য একেক সময়ে সে একেক নাম ধারণ করত। মুসলমান মেয়েদেরকে বলত আরবি-ফারসি নাম, হিন্দু-বৌদ্ধ মেয়েদেরকে বলত বাংলা নাম, খ্রিষ্টান মেয়েদেরকে বলত ইঙ্গ-মার্কিন নাম। তার ছিল অসংখ্য সিম। কোন সিম থেকে কোন কোন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করত, তা লিখে রাখার জন্য সে ডায়েরি খুলেছিল। স্থায়ী সিমের নাম্বার সে কোনো মেয়েকেই দিত না। কোন এলাকায় থাকত, তা সে কোনো মেয়েকেই বলত না। যে মেয়ে যে এলাকায় থাকত, নিজের এলাকা হিশেবে তাকে ঐ মেয়ের এলাকার চেয়ে দূরবর্তী কোনো এলাকার নাম বলত। তার যুক্তি ছিল— মেয়েরা নিকটবর্তী এলাকার ছেলেদের সাথে সখ্য স্থাপনের ব্যাপারে অস্বস্তি বোধ করে, দূরবর্তী এলাকার ছেলেদের ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই ব্যক্তি থাকত ফকিরাপুলে। চেনাপরিচিতজনকে বলত সে আরামবাগে থাকে। 'ফকিরাপুলে থাকি' বলতে সে হীনম্মন্যতায় ভুগত, কারণ 'ফকিরাপুল' শব্দে 'ফকির' আছে। নিজ জেলার নাম সে কাউকেই বলত না; বলত তার জন্মও ঢাকায়, দাদাবাড়িও ঢাকায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদেরকে বলত সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদেরকে বলত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের কাছে নিজেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেই পরিচয় দিত; এর পক্ষে সে যুক্তি দেখাত— মেয়েরা সমপর্যায়ের ছেলেদের সাথে সখ্য গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী। সে একেক মেয়ের কাছে নিজের ব্যাপারে একেক তথ্য দিত, যাতে সেরেফ সিমটা বন্ধ করে দিলেই চাহিবামাত্র সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা যায় এবং যাতে সংশ্লিষ্ট মেয়েটি কোনোভাবেই তাকে চিহ্নিত করতে না পারে। যা হোক, সেই ব্যক্তি বিয়ের জীবনবৃত্তান্তেও আংশিক আসল আংশিক নকল নাম ব্যবহার করেছিল। এখন পরিবারের সদস্যরা তাকে এক নামে ডাকে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন ডাকে আরেক নামে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে যখন অন্য নামে ডাকে, পরিবারের সদস্যরা তখন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।

ধর্মীয় উগ্রবাদীরাও নাম বদলায়— একবার না, বারবার, অসংখ্যবার। এদের একেকজনের কয়েক সেট নাম থাকে। সাংগঠনিক নাম এক রকম, বাড়িভাড়া নেওয়ার সময়ে নাম থাকে এক রকম, জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম অন্য রকম। গ্রেপ্তার হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও, তাই, ধন্দে পড়ে যায় এই চিজের প্রকৃত নাম কী। ফলে, গণমাধ্যমে এদের নাম দেখা যায় এমন— 'ফয়জুল ইসলাম ওরফে কাজল ওরফে আবু জান্দাল ওরফে খালিদ বিন ওয়ালিদ ওরফে ডেভিড'। আত্মঘাতী হামলার সময়ে এরা জানেও না— যে তাকে হামলার নির্দেশ দিয়েছে, তার আসল নাম কী; আবার নির্দেশদাতাও জানে না— যাকে সে নরহত্যার নির্দেশ দিচ্ছে, তার আসল নাম কী। জীবিত ধরা পড়লে একজনের মুখ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে আরেকজনের নাম-পরিচয় উদ্ধার করতে না পারে, সেজন্যই এই 'কাট আউট' পদ্ধতি। কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে দলের একজন যদি আরেকজনকে না চেনে এবং সবাই যদি ছদ্মনাম ব্যবহার করে, তা হলে কর্মসম্পাদনের এই পদ্ধতিকে 'কাট আউট' বলে। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে উগ্রবাদী হামলার পরদিন পুলিশ প্রচার করেছিল— যৌথ অভিযানে নিহত উগ্রবাদীদের নাম আকাশ, বিকাশ, ডন, রিপন, বাঁধন। কিন্তু তাদের ছবি প্রকাশিত হওয়ামাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছেলেপুলেরা মুহূর্তে বের করে ফেলল— এরা আকাশ, বিকাশ, ডন, রিপন, বাঁধন না; এরা নিবরাস ইসলাম, মির সামেহ্ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খাইরুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম।
রুপালি জগতের তারকাদেরকে নাম পরিবর্তন করতে দেখা যায় প্রায়শই। কেউ পরিবর্তন করে অকারণে, কেউ করে নিজের নামকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করার জন্য, কেউ নিজের অতীত মুছে সম্পূর্ণ নতুন জীবন শুরু করার জন্য। রুপালি জগতে নামপরিবর্তনের পেছনে অপরাধমূলক তেমন কিছুর খোঁজ অবশ্য পাওয়া যায় না। লেখালিখির জগতেও স্বনাম পরিবর্তন ডালভাতের মতো। স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লেখার সময়ে অনেক কবিসাহিত্যিক এককালে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন, যাতে সরকারি রোষানল থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়। সরকারি ঝুঁকি কেটে গেলে তারা স্বনামে ফিরেও এসেছেন, কালের গর্ভে তারা স্বনামেই টিকে আছেন। কিন্তু যাদের লেখা দুধভাত, সরকারি-বেসরকারি কোনো ঝুঁকিই যাদের নেই এবং কখনোই আর স্বনামে ফেরেননি; সেইসব লেখকের একটা বড় অংশই ব্যক্তিজীবনে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ অথবা মেরুদণ্ডহীন। অতীতজীবনের কোনো অপরাধ ঢাকার জন্য কিংবা হীনম্মন্যতাজনিত কারণেই তারা নামবদলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। নিজের লেখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস কম থাকলেও অনেক লেখক নাম পালটে কোনো গাম্ভীর্যপূর্ণ নাম ধারণ করে থাকে; তাতে আখেরে অবশ্য লাভ হয় না, উলটো হাস্যরসের যোগান দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ভুয়া নাম ব্যবহার করে প্রথমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, পরে আর্তমানবতার সেবার কথা বলে টাকাপয়সা তুলে একপর্যায়ে অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে গা ঢাকা দেয়। পরবর্তীকালে আবার নতুন নামে অ্যাকাউন্ট খুলে একই পদ্ধতিতে অর্থ আত্মসাৎ করে।
এক সাবেক ছাত্রনেতাকে চিনি; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে যার নামে হত্যামামলা আছে, প্রতিপক্ষের ওপর একাধিক হামলার প্রেক্ষিতে সাধারণ ডায়েরি আছে, আছে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি। মনে করি, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম সাইফুর রাব্বি। আসলে তার নাম সাইফুরও, রাব্বিও। জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম মো. সাইফুর রহমান। পূর্বোক্ত হত্যামামলায় হুলিয়া জারি হলে এবং সে-খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে হুলিয়ায় উল্লিখিত নাম আর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম যাতে মিলে না যায়, সেজন্য রাব্বির এই ব্যবস্থা। হত্যামামলায় হুলিয়া জারি হলে কেউ যেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছবি বা কোনো পোস্টের স্ক্রিনশট প্রচার করে নতুন ইশু তৈরি করতে না পারে, সেজন্য সে আনুষ্ঠানিক নামের সাথে ফেসবুক-নামে এই তফাৎটুকু রেখেছে। অপরাধীরা বরাবরই চেষ্টা করে নিজের নামের ওপর ছুরি চালিয়ে পার পেতে।
অর্থাৎ পতিতা থেকে জিগোলো, ক্রমিক খুনি থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদী, নায়ক-নায়িকা থেকে শিল্পী-সাহিত্যিক— যেকোনো ব্যক্তির নাম পরিবর্তনের পেছনেই একটা অনিবার্য ইতিহাস থাকে। এর অধিকাংশই অসৎ ইতিহাস, হীনম্মন্যতা বা প্রতারণার ইতিহাস, অতীতের অপরাধ আড়াল করার ইতিহাস। কারো-কারো প্রতারণা ধরা পড়ে, কারো-কারোটা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। যারা স্বনাম পরিবর্তন করেছে, তাই, তাদেরকে সন্দেহের চোখে দেখি; তাদের চোখে-মুখে অপরাধ খুঁজে পাই বা অপরাধ খুঁজে বেড়াই। যারা অ্যাফিডেভিট করে নতুন নাম ধারণ করেছে, তাদেরকে সন্দেহের চোখে একটু কম দেখি। বাকিদেরকে শুরুতেই সন্দেহের জালে আটকে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পাই না। স্বনাম পরিবর্তন কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। নাম পরিবর্তন মানে নিজেকে একপ্রকার হত্যা করা। যে ব্যক্তি নিজেকে বা নিজের সত্তাকে হত্যা করতে পারে, তার পক্ষে অন্যকেও হত্যা করা বা করানো সম্ভব। দ্বৈত নামধারী ব্যক্তিবর্গকে কাটাতে হয় প্রহসনের জীবন, যেকোনো মুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ের জীবন, না-ঘরকা না-ঘাটকা জীবন।
আনার খুন না হলে, আনারহত্যার সাথে শীলাশ্রী রহমান নামক কোনো অদ্ভুতনামা নারীর সম্পৃক্ততা না থাকলে এই লেখাটি লেখা হতো না। শীলাশ্রী যদি একেক সময়ে একেক ছদ্মনাম ব্যবহার না করত; তা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করা যেত, তার যাপিত জীবন সম্পর্কে সম্যক জানা যেত, হোসনে আরা বা জাহান আরা থেকে তার শীলাশ্রী হওয়ার যাত্রাটা সম্পর্কে পূঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানা যেত; বোঝা যেত মানুষ কেন কীভাবে কোন পথ দিয়ে আলো থেকে অন্ধকারে তলিয়ে যায়, প্লাস্টিক কীভাবে ইলাস্টিকের মতো দীর্ঘ হয়, চিৎপাতের কড়ি কীভাবে উৎপাতে যায়। শীলাশ্রী সেই সুযোগ রাখেনি। আনার যেভাবে মরে গিয়ে টুকরো-টুকরো হয়েছেন, জীবিত শীলাশ্রী নাম বদলে-বদলে নিজেকে সেভাবেই টুকরো-টুকরো করে ফেলেছে। শীলাশ্রীর জীবনের একটা টুকরো সম্পর্কেও জানার সুযোগ সে রাখেনি। এখানে জানিয়ে রাখি— 'চিৎপাতের কড়ি' মানে 'চিৎ হয়ে' (অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে) উপার্জিত টাকাপয়সা আর উৎপাতে যাওয়া মানে বেহিশেবে খরচ হয়ে যাওয়া। যা হোক, আমি শীলাশ্রীর ওপর আরো বহু বছর নজর রাখব; দেখব অন্য কারো বাগানবাড়িতে গিয়ে সে কখনও শুভশ্রী, তনুশ্রী বা দেবশ্রী হয়ে ওঠে কি না কিংবা হতশ্রী হয়ে ঝুলে থাকে কি না ঢাকা বা কোলকাতার কোনো সেতুর পিলারে। ট্র্যাপ পেতে শিকারের ভবলীলা সাঙ্গ করা হয়ে যাওয়ার পর কোনো হানিকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে— ইতিহাস এমন সাক্ষ্য দেয় না।
২৯ মে ২০২৪
(লেখাটি পড়ে লেখককে সম্মানী পাঠাতে চাইলে অ্যাকাউন্ট নাম্বারের জন্য মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করতে হবে)

No comments

Powered by Blogger.