ctg
Collected
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে আমার পরিচয় হয় মাস্টার্সে পড়া এক বড় ভাইয়ের সাথে। উনার নাম শামীম (ছদ্মনাম)! খুবই আন্তরিক মানুষ। আমাকে স্নেহ করতেন অনেক। বিকেলা বেলা হলের সামনে আমাকে দেখলেই ধরে নিয়ে নাস্তা করাতেন। কিছু না খেতে চাইলেও জোড় করে নিয়ে যেতেন। ভালো ছাত্র ছিলেন। ডিপার্টমেন্টে থার্ড পজিশনে ছিলেন। পড়াশোনার বাইরে উনার সবচেয়ে পছন্দ ছিলো কবিতা আবৃত্তি করা। কিন্তু কন্ঠ ভরাট না থাকায় উনি হতাশ হতেন। আমাকে মজা করে বলতেন "কবিতা এমন চিকনা কন্ঠে হয় না। তোমার কন্ঠটা আমার দরকার ছিলো। কত দিতে হবে বলো!" আমি সেকেন্ড ইয়ারে উঠার আগেই উনার মার্স্টার্স শেষ হয়ে যায়। উনি চলে যান ঢাকায়। এরপর বহুদিন যোগাযোগ ছিলো না। ২০১৭ সালে উনাকে আমি ফেসবুকে পাই। স্ত্রী সন্তান নিয়ে অষ্ট্রেলীয়াতে সেটেলড হয়েছেন। এরপর থেকে টুকটাক মেসেঞ্জারে কথাবার্তা হতো। এখনো হয়। গতকাল ছাত্রলীগ সম্পর্কিত একটা পোস্ট দেখে উনি আমাকে মেসেজ দিলেন। কথা কথায় উনি আমাকে একটা ঘটনা বললেন উনার।
২০২৩ সালে স্ত্রী সন্তান নিয়ে উনি বাংলাদেশে বেড়াতে আসেন। উনার ১৩ বছরের মেয়ের কাছে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গল্প করেছেন। বাবার গল্প শুনে মেয়ে খুবই অবাক হয়। বাংলাদেশে এত সুন্দর ক্যাম্পাস থাকতে পারে সে বিশ্বাস ই করতে চায় না। ফেসবুক ইউটিউবে ক্যাম্পাসের ভিডিও দেখে দেখে মেয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেখার জন্য। উনি অবশেষে স্ত্রী এবং মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন! স্ত্রী সন্তানকে পুরো ক্যাম্পাস দেখালেন। হলের যে রুমে থাকতেন সেখানেও ঘুরিয়ে দেখালেন। মেয়ে খুবই অবাক হয়েছে হলের বাসস্থান দেখে। "এভাবেও থাকা যায়!"
পাহাড়, জংগল, বিচিত্র নানান সব ফুল, পাখি ঝুপড়ী সব দেখা শেষ করে সন্ধ্যায় শহীদ মিনারের পাশে বসে তারা ফুচকা খাচ্ছিলেন। এমন সময় একটা ছেলে এসে উনাকে শহীদ মিনারের দিকে দেখিয়ে বলে "ভাই আপনাকে ডাকছে?" উনি অবাক হলেন। এত বছর পর ক্যাম্পাসে তো তার পরিচিত কেউই নেই। উনি ফুচকা হাতে নিয়েই সেখানে গেলেন। ৬/৭টা ছেলে লাইন ধরে সিঁড়িতে বসে আছে। তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে। সবার চেহারা ঠিক মতো দেখাও যাচ্ছে না। একজন জিজ্ঞাসা করলো "ভাইয়ের বাসা কোথায়?" উনি বললেন, উনি অস্ট্রেলীয়াতে থাকেন। এই ক্যাম্পাসের ই সাবেক ছাত্র। ২০০০/২০০১ সেশন। এটা শুনে পাশ থেকে একটা ছেলে এসে বললো, "প্রমান কি আপনি সাবেক ছাত্র?" শামীম ভাই বিরক্ত হলেন। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললেন "প্রমান কেন করতে হবে? আপনারা কে? আপনাদের কাছে কেন আমার প্রমান করতে হবে!?" এই কথা বলার সাথে সাথে একজন উঠে থাপ্পড় মারলো। সাথে সাথে আরও কয়েকজন উঠে কিল ঘুসি মারতে লাগলো। হৈচৈ শুনে উনার স্ত্রী এবং মেয়ে সেখানে ছুটে গেলেন। তারা তাদেরকেও গালাগালি করা শুরু করলো। তারপর স্ত্রী এবং মেয়ের সামনেই উনাকে কান ধরে উঠবস করালো। এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো " খা* পো* শিবির! এই ক্যাম্পাস থেকে তুই জীবিত যাইতে পারবি না।" শামীম ভাই গাড়ীর ড্রাইভারকে ডাকতে লাগলেন। ড্রাইভার আশেপাশে ই চা খাচ্ছিলো হয়তো। উনি তাকে কল দেয়ার জন্য ফোন বের করতে পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন ফোনটা পকেটে নাই। উনার মানিব্যাগও নাই। ওরা নিয়ে নিয়েছে।
শামীম ভাইকে কান ধরে উঠবস করেই তারা শান্ত হয় নি। মাটিতে উপর হয়ে নাকে খত দিয়ে বলতে বললো "আমি শিবির। আমি আর এই ক্যাম্পাসে কখনো আসব না।" তা না হলে স্ত্রী সন্তান সহ সবাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী এবং মেয়ের সামনেই উনি বাধ্য হোন নাকে খত দিতে।" সব সময় মনে রাখবি চবি ছাত্রলীগ থাকতে এই ক্যাম্পাসে কখনো তোরা শিবির পা দিতে পারবি না!" এই বলে তারা উনাকে ছেড়ে দিলো। শামীম ভাই ড্রাইভারকে খুঁজে পেয়ে এরপর কোনরকম গাড়ীতে উঠে দ্রুত ক্যাম্পাস ছাড়েন।
পুরোটা পথ উনার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসেছে। লজ্জায় ঘৃনায় অপমানে স্ত্রী সন্তানের দিকে তাকাতেও পারছিলেন না তিনি। মেয়ের কাছে কত গল্প করেছিলেন এই ক্যাম্পাস নিয়ে। উনি অষ্ট্রেলিয়া ফিরে যান। কোন আইনি ব্যাবস্থাও নেন নি। কাউকে জানানও নি। এরকমভাবে অসম্মানিত হবার ঘটনা উনি সম্মানের ভয়ে কাউকেই বলেন নি। আর বলেই বা কি হবে! ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কে কথা বলার আছে তখন! আর এই অপমান কি আর মুছে যাবে! উনি চুপ হয়ে গেলেন। সেদিনের পর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গল্প তো দূরে থাক আর একটা শব্দও কখনো মেয়ের সাথে করেন নি।
আমাকে উনি বারণ করেছেন উনার পরিচয় প্রকাশ না করতে যেহেতু ব্যাপারটা উনার জন্য অসম্মানজনক। তাই উনার পরিচয় আমি দিলাম না। নিজের স্ত্রী সন্তানের সামনে, নিজের ই ক্যাম্পাসে একজন মোস্ট সিনিয়র সাবেক ছাত্র হয়ে যদি এভাবে অপমানিত হতে হতো আপনাদের কেমন লাগতো?
এই ছাত্রলীগকে শুধু নিষিদ্ধ করাই কি যথেষ্ট?
Jayef Khan Nadim
No comments