Header Ads

Header ADS

মাহমুদুল হাসান এটর্নি এট ল

 Facebook

Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
Facebook
কত ভয়াবহ ছিল দিন গুলি
May be an image of 1 person, smiling and text
আমি মাদ্রাসায় পড়ে পরিচয় গোপন করেছি, বলে যান আমি অপরাধী।
আমি মাদ্রাসায় পড়েছি, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায়। দাখিল-আলিম শেষ করে ২০০৯-১০ সেশনে ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে ছবিটা দেখছেন এটা ভর্তি কোচিং UCC এর প্রসপেক্টাস। ছবিতে লেখা আপনি আমার যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দেখছেন, রামগঞ্জ সরকারি কলেজ, আমি এর নাম ছাড়া আর কিছুই জানি না।
আমি গরিব পরিবারের সন্তান, এবং আমার কাছে হলে থাকার কোনো বিকল্প ছিল না। ২০১০ সালে হলে আসার আগে আমি অনেক গল্প শুনেছিলাম মাদ্রাসার ছাত্রদের আর শিবিরের উপর নির্যাতনের, কাউকে দ্বিতীয় তলা থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে, প্লাস দিয়ে কারো আংগুলের নখ তুলে নেয়া হয়েছে ইত্যাদি। যেদিন প্রথমে হলে আসি, মুহসিন হলে, আমার এসএম হলে থাকা এক মাদ্রাসার বন্ধুকে ফোন দিলাম। ও বললো যেন কোনোভাবে মাদ্রাসায় পড়েছি এটা না বলি। মাদ্রাসার ছেলেরা সন্দেহের তালিকায় সবার আগে থাকে। ওকে বললাম, আমার খোঁজ না পাওয়া গেলে যেন মুহসিন হলে খোঁজ নেয়।
হলে আসার পর, মোবারক নামের দ্বিতীয় বর্ষের একজন আমাকে কামারুজ্জামান নামে একজন নেতার কাছে নিয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হলো আমার ছোট কাকার বয়সী, ৩৫-এর কাছাকাছি হবে। সময়টা হয়তো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি টুকুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেদিন মারা হয়েছিল, তার আগের বা পরের সময়ের ঘটনা। নেতা কামারুজ্জামান তখন তার গল্প বলছিল—সে কীভাবে শিবিরকে মারধর করেছে সেসব ফিরিস্তি। তার অনেক লম্বা ইতিহাস। সে তার হাত দিয়ে পিস্তলের অঙ্গভঙ্গি করে দেখাচ্ছিল। আমার সাথে ছিল আমার আইন বিভাগের আরেক বন্ধু। আমার বন্ধু আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর ছিল, কিন্তু এটা আমাদের জন্য প্রথম। ভেতরে ভেতরে ভয়ে জমে গিয়েছিলাম। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি কোথায় পড়াশোনা করেছি। আমি বললাম, "গ্রামের কলেজে।" সেদিন থেকেই আমার পরিচয় হয়ে গেল "গ্রামের কলেজ।" ছবিতে দেখতেই পাচ্ছেন, একটা কলেজের নাম লেখা। আমি আসলে সে কলেজের নাম ছাড়া কাউকেই চিনতাম না। এই ভাই আমার কোনো সিভি নেয়নি বা ফর্ম পূরণ করতে হয়নি, আমাকে আদৌ জিজ্ঞেসও করেনি আমি কি ছাত্রলীগ করতে চাই কিনা। আমি ছাত্রলীগ হয়ে গেলাম। বলে রাখা ভালো, যদি মেধার ভিত্তিতে সিট দেয়া হতো, সবার আগে যারা পেত, আমি তাদের একজন হতাম। এই সিট আমার অধিকার ছিল, কারো দয়া নয়।
যাইহোক, গণরুমে ৪১ জন থাকি। তিনটা খাট। খাটে ময়মনসিংহ আর ওইদিকের কয়েকজন ঘুমাতো, কারণ তখন হলে তাদের দাপট ছিল। যাদের নিচে জায়গা হতো না তারা ঘুমাতো ছাদে, কেউ রিডিং রুমে। ছারপোকা, মশা, গাদাগাদি—বহু রাত ঘুমাইনি। শুরু হয়ে গেল রুম পাওয়ার প্রতিযোগিতা। নিয়মিত গেস্টরুম করা, মিছিলে যাওয়া, বড় ভাইদের শোডাউনে যাওয়া। ক্লাসে যাওয়ার পথে পথ আটকে প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া। একদিন ডাক আসলো মোতালেব প্লাজায়—কোনো এক দোকানদার এক বড় ভাইকে কিছু বলেছে, তাকে শাস্তি দিতে হবে, যেতে হলো। মাঝে মাঝে পাঠানো হতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, বহিরাগত ছেলে-মেয়ে যারা একসাথে বসে থাকে, তাদের মারার জন্য। সেটা ছিল মূলত মারার প্রশিক্ষণ। মাঝে মাঝে নন-পলিটিক্যাল বড় ভাইদের ধমক দেয়ার কাজ পড়ত যেন তারা হল ছেড়ে দেয় তাড়াতাড়ি। এই চক্রে সবচেয়ে ভালো করতো নিচের সারির সাবজেক্টগুলোর ছাত্ররা। তারাই সবখানে নেতৃত্ব দিত। তারাই ক্রমে আমাদের ওপর খবরদারি শুরু করে।
ফাস্ট ফরওয়ার্ড, ২০১০ সালের অক্টোবর মাস। আমাদের তখন মেরামত করা হচ্ছে এমন একটা রুমে শিফট করা হয়। তাজা সিমেন্টের গন্ধ। রাত তিনটা-সাড়ে তিনটা হবে। একজন রুমের দরজা ঠেলে আমাদের ডেকে তোলে। তার সাথে যেতে বলে। আমাদের দ্বিতল থেকে তৃতীয় তলায় নিয়ে গেল। সেটা ছিল সেক্রেটারি গ্রুপের ব্লক। সে আমাদের একেকজনের হাতে এক একটা অস্ত্র ধরিয়ে দেয়। আমার হাতে পড়লো চাপাতি। ওই কয়েক সেকেন্ড ছিল জীবনে প্রথমবার এবং শেষবারের মতো অতবড় একটা দা হাতে নেওয়া। যখন কিছুটা বুঝতে পারলাম এখানে কিছু একটা হবে, কিছুর একটার প্রস্তুতি চলছে, আমরা তিন রুমমেট দৌড় দিলাম। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে এক দৌড়ে হলের বাইরে। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ছিল। একজন বলছিল "মহিউদ্দিনরে কে বলছে আমারে পোস্ট দিতে?" আমার ওই দুই রুমমেট এখনো আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে।
বুদ্ধি করে যদি দৌড় না দিতাম, কারো চাপাতি আমাকে যখম করতো, অথবা আমার চাপাতি কাউকে।
আমরা বাইরে বের হয়ে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে শুরু হলো ধুম ধাম, পটাশ, ও মাগো ও বাবাগো। বাইরে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে থাকে। পরের দিনের খবর—"মুহসিন হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মারামারি, আহত.... "।
এরপর কয়দিন থমথমে অবস্থা। কারো চেহারার দিকে তাকাতেই ভয় পাই।
আমাদের ইয়ার-এ রহমত উল্লাহ নামে একটা ছেলে ছিল। গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল। যতবার হলে মারামারি হয়েছে, ততবারই মার খেয়েছে।
ফাস্ট ফরওয়ার্ড, ২০১১ সাল। হলে ৩৮ জন শিবিরের তালিকার হদিস পাওয়া গেল। শিবিরের সভাপতিকে চারতলা থেকে ফেলে দেয়া হয়। বেঁচে সে পালিয়ে গেছে, এতটুকুই জানি। সেক্রেটারি আমার ডিপার্টমেন্টের এক ব্যাচ সিনিয়র। হল ডাইনিংয়ের সামনে আমার সামনেই তাকে রড দিয়ে যেভাবে পেটালো, কোনো কুকুর-বিড়ালকেও কেউ একটু মায়া করে। এটা লিখতে গিয়ে আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
তালিকায় আমার নাম নেই, কিংবা থাকার কথাও না। আমি যথারীতি হলে আছি। তার তিন-চার দিন পর হলে সামনে নাস্তা করছি। এমন সময় আমার এক বন্ধু আমাকে দেখে বলে, "কিরে তুই এখনো হলে? তোকে বের করে দেয়নি?" সে জানতো আমি মাদ্রাসায় পড়েছি, কারণ ওর বাড়ি আমার রামগঞ্জ উপজেলায়। আমি বললাম, "এই কী বলিস এসব, মজা করিস কেন?" পাশে বসা দুই ছাত্রলীগ নেতা, যারা আগের বছর ছাত্রদল নেতা টুকুকে মারার নেতৃত্ব দিয়েছে। আমি লক্ষ্য করলাম তারা কানাঘুষা করছে। তাদের একজন আমাকে চেনা মুখে চিনতো, কারণ আমার আরেক বন্ধুর রুমমেট। সে হয়তো বললো, "আমি চিনি, চাপ নিস না, নিরীহ পোলা। তালিকায় নাম নাই।" আমি মনে মনে দোয়া পড়তে পড়তে হাঁটতে হাঁটতে হলের মাঠের দিকে চলে এলাম। এই অংশটা লিখলাম এটা বোঝানোর জন্য যে মাদ্রাসায় পড়েছি এটা জানানোটা কেমন বিপদ ডেকে আনতো।
বলে রাখি এর পরের বছর আরো ৪০-৪২ জন যারা বেশির ভাগ ছিলো দ্বিতীয় বর্ষের এদের শিবিরে তালিকা করে এদের পিটিয়ে বের করে দেয়া হয়। সেখানেও আমার নাম ছিলনা বা কোনো ভাবে আসারো কথা না।
এবার আসি, ফাইন্যান্সে পড়ত, তাবলীগ করতো আমাদের এক ব্যাচমেট। দাড়ি-টুপি রাখা শুরু করেছে। প্রতি গেস্টরুমেই প্রশ্ন হতো, "এই, তুই শিবির করিস?" সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলতো, "না ভাই।" কয়েকদিন পর সে দাড়ি-টুপি ছেড়ে আবার থ্রি কোয়ার্টার গেঞ্জি ধরেছে।
আমার আইন বিভাগের আরেক বন্ধু, যার রেজাল্ট খুব ভালো, মাদ্রাসায় পড়েছে। আমাদের সময়ের সেরাদের একজন। ওর বড় ভাই হলে থাকতো, সেই সুবাদে সে বড় ভাইয়ের সিটে উঠেছে, রাজনীতি করতে হয়নি। ছাত্রজীবনের শেষের দিকে এসে দেখা গেলো ছাত্রলীগের নাম খুব খারাপ হচ্ছে। একদিন হলে ফিরে দেখি হলের নোটিস বোর্ডে ছাত্রলীগের বর্ধিত কমিটিতে মোটামুটি ১৫০ থেকে ২০০ জনের নাম। জীবনে রাজনীতি না করা আমার ভালো রেজাল্ট করা বন্ধুর নাম তালিকায় দেখে আমরা অবাক। তার রুমে গিয়ে বললাম, "মিষ্টি খাওয়া" সে বললো, "এটা আমার নাম না, আমার নামে আরেকজন জুনিয়রের নাম।" যার রেফারেন্স দিলো, সে দাড়ি-টুপি পরা হুজুর। দুইজনের কাউকেই ছাত্রলীগে মানায় না। কিন্তু এই দুইজনের একজনের নামতো নিশ্চিত করে ছিল সেই ১৫০-২০০ জনের তালিকায়। আমি আজও জানি না নিশ্চিত করে কে ছিল সেটা। তবে সেদিন হয়েছে, ছাত্রলীগের কালো নাম চকচকে করতে মেধাবী আর ভালো ইমেজের ছেলেদের নাম গুরুত্বহীন এই পোস্টগুলোতে দেয়া হতো।
সময়ের চক্রে আমার অনেক বন্ধুর নামই বিভিন্ন বিভাগের কমিটিতে দেখা যেতে শুরু করলো। আইন বিভাগের সোভন, রাব্বানী, জয়, সঞ্জিত, সবশেষে সাদ্দাম—এদের এলিট সাবজেক্ট থেকে তুলে আনা হয়েছিল ছাত্রলীগের কালি মোছার জন্য এবং আইওয়াশের কাজে।
এটা আমার গল্প। আমার গণরুমের ৪১ জনের অনেকেই আছে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে, আমার অন্যান্য বন্ধুরাও আছে। সবাইকে সাক্ষী রেখে আমি এই গল্প পেশ করলাম।
এখন আপনি যদি বলেন আমি পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগে ঢুকেছি, আমি আপনার গলা চেপে ধরবো। আমি নিজ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছি, হাতে চাপাতি ধরার জন্য নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় বছর শিবির ট্যাগ খাওয়ার ট্রমা নিয়ে বেঁচেছি। তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আপনি শিবিরকে গালি দেন, হাজারটা—আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু যদি বলেন আমি পরিচয় গোপন করেছিলাম, আপনার জানার কথা ছিল কেনো করতে হয়েছে সেদিন? যদি না জানেন, তবে আজকেও আপনার কথা বলার কোনো অধিকার নেই।
পরিশেষে বলি, আমি তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় পড়েছি, আমি গর্বিত। আমি বুক ফুলিয়ে পরিচয় দেই। এ প্রতিষ্ঠান আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তার আলোয় আমি পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত প্রাঙ্গনে পা রেখেছি। আলহামদুলিল্লাহ। শুধু মাঝখানে এই আওয়ামী ফ্যাসিবাদ এবং আপনার মতো ফ্যাসিবাদ যারা আমাকে ছাত্রলীগ বানিয়েছে, তারা চাপিয়ে দিয়েছে এতসব যন্ত্রণা এবং অসহায়ত্ব।
লেখকের ব্যাক্তিগত মতামত।
মাহমুদুল হাসান
এটর্নি এট ল

No comments

Powered by Blogger.